

“বিষ খেয়েই তো বেঁচে আছি”—কথাটি শুনতে হয়তো কৌতুকের মতো মনে হয়, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। আমরা কী খাচ্ছি, কোথা থেকে কিনছি, কত টাকা দিয়ে কিনছি—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অনেক সময় মনে হয়, নিরাপদ খাবার যেন সাধারণ মানুষের জন্য দিন দিন দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে।
বাজার থেকে টাটকা সবজি কিনে আমরা ভাবি, পরিবারের জন্য ভালো খাবার নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু সেই সবজিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের ব্যবহার হয়েছে কি না, তা সাধারণ ক্রেতার পক্ষে বোঝা কঠিন। মাছ, মাংস, ফলমূল, দুধ কিংবা অন্যান্য খাদ্যপণ্য—কোনটি সত্যিকার অর্থে নিরাপদ, আর কোনটির ভেতরে লুকিয়ে আছে ক্ষতিকর উপাদান, তা বুঝতে গিয়ে সাধারণ মানুষ অনেকটাই অসহায়।
শুধু বাজারের খাবারেই প্রশ্ন নয়; বাইরে হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেতে গেলেও একই শঙ্কা। দামী রেস্তোরাঁয় ৫০০ টাকা দিয়ে খাবার খেলাম, আর ফুটপাতের হোটেলে ১০০-১৫০ টাকা দিয়ে খেলাম—যদি দু’জায়গাতেই খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তাহলে শুধু বেশি টাকা খরচ করে খাওয়ার সার্থকতা কোথায়? অন্তত কম দামে খেলে কিছু টাকা তো পকেটে থাকে!
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে সস্তা খাবারই ভালো কিংবা সব দামী হোটেলের খাবার ভেজাল। বরং প্রশ্নটি হলো—খাদ্যের নিরাপত্তা কি দামের ওপর নির্ভর করবে? একজন সাধারণ মানুষ কি টাকা বেশি দিলেই নিরাপদ খাবারের নিশ্চয়তা পাবে? তার সন্তান যে খাবার খাচ্ছে, সেটি নিরাপদ কি না—এই নিশ্চয়তা পাওয়ার অধিকার কি তার নেই?
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, খাদ্যে ভেজাল বা অনিরাপদ খাদ্যের ঝুঁকি শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা। কারণ একজন অসাধু ব্যবসায়ী যখন মুনাফার জন্য মানুষের খাবারে ক্ষতিকর উপাদান মেশান, তখন তিনি শুধু একজন ক্রেতাকে ঠকান না—তিনি একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের সঙ্গে খেলেন।
আইন থাকা জরুরি, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। সাধারণ মানুষের মনে যদি এমন ধারণা জন্ম নেয় যে আইন দুর্বল মানুষের জন্য কঠিন, অথচ প্রভাবশালী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ—তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থায় ফাটল ধরবেই। আইনের জাল যদি মাকড়সার জালের মতো হয়, যেখানে ছোটরা আটকে যায় আর বড়রা সহজেই বেরিয়ে যায়, তাহলে সেই ব্যবস্থা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে ভয় নিয়ে সবজি কিনবে না। যেখানে মা-বাবা সন্তানকে খাবার খাওয়ানোর আগে বারবার ভাববেন না—“এই খাবারটি কি বিষাক্ত?” যেখানে গরিব মানুষ কম দামে খাবার কিনলেও নিরাপদ খাবার পাবে, আবার ধনী মানুষ বেশি দাম দিলেও শুধু টাকার কারণে নিরাপত্তা কিনতে হবে না। নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।
অনেকেই বলেন, বিদেশে গেলে নাকি ভালো ও নিরাপদ খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার সামর্থ্য তো সবার নেই। সাধারণ মানুষ নিজের দেশেই জন্ম নেয়, নিজের দেশেই কাজ করে, কর দেয়, পরিবার গড়ে এবং এই দেশের বাজার থেকেই খাবার কিনে জীবন চালায়। তাই নিরাপদ খাবারের জন্য তাকে দেশ ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করতে হবে কেন?
আমাদের কথা হয়তো অনেক সময় ক্ষমতাবানদের কানে পৌঁছায় না। কিন্তু সাধারণ মানুষের নীরব কষ্টকে চিরদিন উপেক্ষা করা যায় না। মানুষ শুধু বড় বড় উন্নয়ন, উঁচু ভবন কিংবা রাস্তা চায় না; মানুষ চায় নিরাপদ জীবন, নিরাপদ খাদ্য এবং ন্যায়বিচার।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ—আমরা কি শুধু বেঁচে থাকার জন্য খাব, নাকি সুস্থভাবে বাঁচার জন্য খাব?
“মরলে কী, বাঁচলেও কী”—এই হতাশা কোনো জাতির ভবিষ্যতের ভাষা হতে পারে না। আমাদের বলতে হবে—আমরা মরতে চাই না, আমরা নিরাপদে বাঁচতে চাই। আমরা বিষ নয়, খাবার চাই। আমরা প্রতারণা নয়, সততা চাই। আমরা ভেজাল নয়, নিরাপদ বাজার চাই।
কারণ সাধারণ মানুষের জীবন কোনো পরীক্ষাগারের নমুনা নয়। তার জীবন, তার পরিবার এবং তার সন্তানের ভবিষ্যৎ—সবকিছুরই মূল্য আছে। সেই মূল্য রক্ষা করার দায়িত্ব ব্যবসায়ী, ভোক্তা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্র—সবার।
লেখক
মোঃ বদরুল ইসলাম
মুন্সী বাজার
কমলগঞ্জ
মৌলভীবাজার
সিলেট।
Comments are closed.







