
সমাজে আমরা প্রতিনিয়ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি। সভা-সমাবেশে দুর্নীতিমুক্ত সমাজের অঙ্গীকার শুনি, বক্তৃতায় সুশাসনের কথা শুনি, আইনের শাসনের কথা শুনি। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, দুর্নীতি শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের গভীরে ঢুকে পড়া এক ভয়ংকর ব্যাধি।
মূর্খ মানুষ সাধারণত দুর্নীতির জটিল হিসাব জানে না। দিনমজুর সারাদিন শ্রম দিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। কৃষক মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলায়। তাদের জীবনে প্রতারণা বা দুর্নীতির সুযোগ যেমন সীমিত, তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের ক্ষমতাও তাদের হাতে নেই। অথচ সমাজের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে বড় ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে শিক্ষিত, ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী একটি শ্রেণি।
এখানেই আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
যে শিক্ষা মানুষের বিবেক জাগ্রত করার কথা, সেই শিক্ষাই কখনো কখনো দুর্নীতির কৌশল শেখানোর হাতিয়ার হয়ে উঠছে। যে কলম দিয়ে মানুষের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেই কলমেই তৈরি হচ্ছে অনিয়মের নথি। যে পদ মানুষের সেবা করার জন্য, সেই পদই অনেকের কাছে হয়ে উঠছে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার সিঁড়ি।
আর সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—আমাদের সমাজ অপরাধের বিচারও অনেক সময় মানুষের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান দেখে করতে চায়।
পেটের দায়ে কোনো দরিদ্র মানুষ পাঁচ টাকার একটি পণ্য চুরি করলে তাকে ধরে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়, অপমান করা হয়। কিন্তু কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, সে যদি দামি পোশাক পরে, গাড়িতে চড়ে, প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করে—তাহলে সমাজের একটি অংশ তাকে এখনও সম্মানের চোখে দেখে।
গরিবের চুরি অপরাধ, আর ক্ষমতাবানের লুটপাটকে যদি আমরা কৌশল বলে পাশ কাটিয়ে যাই—তাহলে সেই সমাজে ন্যায়বিচার কোথায়?
একজন মানুষের গায়ে টাই আছে বলেই তিনি সৎ—এমন কোনো নিয়ম পৃথিবীতে নেই। আবার একজন শ্রমিকের গায়ে পুরোনো পোশাক থাকলেই তিনি অসৎ—এমন কথাও সত্য নয়। মানুষের পরিচয় পোশাকে নয়, চরিত্রে। মানুষের মর্যাদা সম্পদে নয়, সততায়।
কিন্তু আমাদের সামাজিক বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে তার উল্টো চিত্র দেখায়। যার টাকা আছে, তার কথার মূল্য বেশি। যার ক্ষমতা আছে, তার পরিচিতির পরিধি বড়। যার গাড়ি আছে, তার জন্য দরজা খুলে যায়। আর যার হাতে শুধু শ্রমের শক্তি, তার কথা অনেক সময় শোনার মানুষও পাওয়া যায় না।
এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।
দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; দুর্নীতি ধীরে ধীরে মানুষের বিশ্বাসকে ধ্বংস করে। একজন সাধারণ নাগরিক যখন দেখে যোগ্যতা নয়, ঘুষ ও পরিচয় কাজ পাওয়ার চাবিকাঠি; ন্যায় নয়, প্রভাবশালীর কথাই শেষ কথা—তখন তার রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়। তরুণ প্রজন্মের মনে জন্ম নেয় হতাশা। তারা ভাবতে শেখে, সততার কোনো মূল্য নেই।
এই ধারণাটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন কিংবা বড় বড় প্রকল্প দিয়ে হয় না। দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটে তখনই, যখন মানুষের মধ্যে ন্যায়বোধ, সততা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।
দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে তাই শুধু দুর্নীতিবাজ ধরলেই হবে না; দুর্নীতিকে যারা প্রশ্রয় দেয়, তাদের বিরুদ্ধেও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঘুষ নেওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি নিজের কাজ আদায়ের জন্য ঘুষ দেওয়াকেও স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। দুর্নীতির অর্থে গড়ে ওঠা বিলাসী জীবন দেখে মুগ্ধ হওয়ার সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে।
আইনের প্রয়োগ হতে হবে সবার জন্য সমান। দরিদ্রের অপরাধ যেমন অপরাধ, ধনীর অপরাধও তেমনি অপরাধ। খালি পায়ের মানুষের বিচার যেমন হবে, টাই পরা মানুষের বিচারও একই আইনে হতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—একজন দিনমজুর হয়তো রাষ্ট্রের কোটি টাকা চুরি করতে পারে না, কিন্তু তার একদিনের শ্রম দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে। একজন কৃষক হয়তো বড় বড় প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করতে পারে না, কিন্তু তার ঘামেই দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান আসে। তাদের অবদানকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
আজ প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষের মূল্যায়ন হবে তার পোশাক, পদবি কিংবা সম্পদ দিয়ে নয়—তার সততা, মানবিকতা ও কর্ম দিয়ে।
টাইয়ের আড়ালে থাকা দুর্নীতিকে সম্মান আর খালি পায়ের ক্ষুদ্র অপরাধকে নির্মম শাস্তি—এই দ্বৈতনীতি কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।
আমরা যদি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই, তাহলে প্রথমে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। দুর্নীতিবাজের অর্থ নয়, তার চরিত্র দেখতে হবে। ক্ষমতা নয়, সত্যকে সম্মান করতে হবে। আর আইনকে হতে হবে অন্ধ—যাতে সে মানুষের পোশাক দেখে নয়, অপরাধ দেখে বিচার করে।
কারণ শেষ পর্যন্ত সমাজের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে, নাকি শুধু দুর্বল মানুষের অপরাধের বিরুদ্ধে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের সমাজ কতটা সভ্য, কতটা ন্যায়ভিত্তিক এবং কতটা মানবিক।
লেখক
মোঃ বদরুল ইসলাম
মুন্সী বাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট।