
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ। জনগণের আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের ওপরই একটি সরকারের সফলতা নির্ভর করে। তাই বর্তমান সরকারের কাছে আমার একান্ত ও আকুল আবেদন—এই দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন, মানুষের মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করুন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কষ্ট লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের একটি বড় অভিযোগ ছিল—তারা সবসময় ন্যায়বিচার পায়নি। ক্ষমতাবানদের জন্য এক ধরনের ব্যবস্থা আর সাধারণ মানুষের জন্য অন্য ধরনের বাস্তবতা—এমন ধারণা মানুষের মনে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। মানুষ চেয়েছে আইনের শাসন, চেয়েছে ন্যায়বিচার, চেয়েছে রাষ্ট্রের কাছে সমান মর্যাদা। কিন্তু যখন সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
আমরা চাই না সেই পুরোনো চিত্র আবার ফিরে আসুক। বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। মানুষ চায়—আইনের চোখে সবাই সমান হবে। একজন সাধারণ নাগরিক যেমন আইনের কাছে বিচার পাবেন, তেমনি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতাও অপরাধ করলে আইনের আওতায় আসবেন। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন এবং কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ বা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে না পারেন।
ন্যায়বিচার শুধু আদালতের চার দেয়ালের বিষয় নয়; ন্যায়বিচার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। একজন কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না, একজন শ্রমিক তার শ্রমের যথাযথ পারিশ্রমিক পাচ্ছেন কি না, একজন শিক্ষার্থী তার যোগ্যতা অনুযায়ী সুযোগ পাচ্ছে কি না, একজন রোগী চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে কি না—এসবও ন্যায়বিচারের অংশ।
তাই বর্তমান সরকারের প্রতি আমাদের আরেকটি বড় প্রত্যাশা—মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে গুরুত্ব দেওয়া। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার। সাধারণ মানুষ যেন দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের জন্য অসহায় হয়ে না পড়ে, চিকিৎসার অভাবে যেন কোনো পরিবার সর্বস্বান্ত না হয়, মেধাবী তরুণ যেন যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশ হয়ে না পড়ে—এ বিষয়ে সরকারকে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষ করে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। যারা মাঠে-ঘাটে পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, তাদের জীবনমান উন্নত না হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কখনো পূর্ণতা পাবে না। কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন, শ্রমিক তার শ্রমের মর্যাদা পাবেন—এটাই হওয়া উচিত একটি কল্যাণরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
মানুষকে মূল্যায়ন করতে হবে তার যোগ্যতা, সততা ও কর্মের ভিত্তিতে। দলীয় পরিচয়, আত্মীয়তা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার কারণে কেউ যেন অন্যায্য সুবিধা না পান। রাষ্ট্রে যদি যোগ্যতার মূল্যায়ন হয়, সৎ মানুষ যদি সম্মান পান এবং পরিশ্রমী মানুষ যদি সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে দেশও দ্রুত এগিয়ে যাবে।
একই সঙ্গে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি। একজন নাগরিক সরকারের প্রশংসা করার অধিকার যেমন রাখেন, তেমনি সরকারের ভুল-ত্রুটির সমালোচনা করার অধিকারও রাখেন। গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়; গণতন্ত্র মানে মানুষের কথা বলার অধিকার, ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিজের দাবি জানানোর অধিকার। মতের পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই পার্থক্য যেন কোনোভাবেই মানুষের ওপর অন্যায় আচরণের কারণ না হয়।
আর একটি বিষয়ে বর্তমান সরকারের প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ—চাঁদাবাজি, দখলদারি, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। কোনো নেতা বা কর্মী যদি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে, ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে কিংবা ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে মানুষের ওপর অন্যায় করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারণ একজনের অপকর্মের দায় শেষ পর্যন্ত পুরো সংগঠন ও সরকারের ভাবমূর্তির ওপর এসে পড়ে। জনগণ কোনো দলের নামের কাছে জিম্মি হতে চায় না; জনগণ চায় সুশাসন। তারা চায় নিরাপদে ব্যবসা করতে, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে এবং নিজের পরিশ্রমের উপার্জন নিয়ে নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে।
মনে রাখতে হবে—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করা একটি সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন। জনগণ যখন মনে করে সরকার তাদের পাশে আছে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাদের বিশ্বাস বাড়ে। আর যখন মানুষ মনে করে তাদের কথা কেউ শুনছে না, তখন রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে থানায় গেলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের আশা করবে, আদালতে গেলে ন্যায়বিচারের বিশ্বাস নিয়ে দাঁড়াবে, সরকারি অফিসে গেলে সম্মান পাবে এবং রাস্তায় চলতে গিয়ে কোনো চাঁদাবাজ কিংবা ক্ষমতাবানের ভয় থাকবে না।
আমরা চাই এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে সরকার জনগণের ওপর নয়, জনগণের জন্য কাজ করবে। যেখানে ক্ষমতা হবে সেবার মাধ্যম, রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণের পথ এবং রাষ্ট্র হবে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকারের আশ্রয়স্থল।
পরিশেষে বর্তমান সরকারের কাছে আমার বিনীত আবেদন—অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে চলুন। মানুষের ক্ষোভের কারণগুলো বুঝুন, মানুষের কথা শুনুন এবং মানুষের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন, মৌলিক চাহিদা পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিন, যোগ্য মানুষকে মূল্যায়ন করুন, গণতান্ত্রিক অধিকারকে সম্মান করুন এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করুন।
কারণ জনগণ কোনো সরকারের শত্রু নয়; জনগণই রাষ্ট্রের মালিক।
সরকারের প্রতি মানুষের আজ একটাই প্রত্যাশা—
ন্যায়বিচার চাই, নিরাপত্তা চাই, মর্য
লেখক।।
মো: বদরুল ইসলাম, মুন্সিবাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার