

অগ্রযাত্রা সংবাদ ডেস্ক:
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর সময়কাল ঘিরে সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ এখন তীব্র বিতর্কের বিষয়। একদিকে গত সরকারের বক্তব্য, “দেশে একজনও সাংবাদিক নির্যাতন হয়নি।” অন্যদিকে অনুসন্ধানী তথ্য বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার কথা। এক সমিক্ষা অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে ১৭৭০ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ৬৯১ জন সাংবাদিক কারাগারে ছিলেন এবং ২৪৫ জনের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে তথাকথিত সাজানো মামলা।
এই পরিসংখ্যান গত সরকারের দাবীর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। সরকারের এক সাকেক নারী উপদেষ্টা সম্প্রতি গণমাধ্যমে দাবি করেন, এই সময়ে একজন সাংবাদিকও নির্যাতনের শিকার হননি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব গ্রেপ্তার বা মামলা হয়েছে সেগুলো নিয়মিত আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু মানবাধিকার বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, যদি নির্যাতন না-ই হয়ে থাকে, তাহলে এত বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা কীভাবে ঘটল। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিভিন্ন ধরনের চাপ ও হয়রানির চিত্র।
মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে শারীরিক হামলা, ডিজিটাল মাধ্যমে হুমকি, তথ্য প্রকাশের পর প্রশাসনিক চাপ, দীর্ঘ সময় ধরে জামিনবিহীন আটক এবং পেশাগত বাধা, এসব অভিযোগ একাধিক জেলা সাংবাদিকদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারগুলো দাবি করেছে, মামলার কাগজপত্রে অসঙ্গতি রয়েছে এবং অভিযোগের ভিত্তি খুবই দুর্বল। আইনজ্ঞদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সাংবিধানিক অধিকার। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তার সবসময় নির্যাতনের সমার্থক নয়, কিন্তু যখন সংখ্যাটি অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয় এবং একই সময়ে সরকারী পর্যায়ে ‘শূন্য নির্যাতন’-এর দাবী আসে, তখন বিষয়টি স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে।
কারণ গ্রেপ্তার, দীর্ঘ কারাবাস এবং ধারাবাহিক আইনি চাপ, এসবই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলে। কারাবন্দি সাংবাদিকদের সহকর্মীরা বলছেন, মাঠে কাজ করার পরিবেশ আগের চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সংবেদনশীল ইস্যু কভার করতে গিয়ে নজরদারি ও চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক সংবাদ সংগ্রহ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বাড়ছে। পরিস্থিতির এই দ্বৈত বয়ান, সরকারী দাবী বনাম অনুসন্ধানী তথ্য, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আর যদি সরকারি দাবি সঠিক হয়, তবে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সেই সত্যও প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরপেক্ষ তথ্য যাচাই, ঘটনার প্রকৃতি নির্ধারণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কারণ সাংবাদিক নিরাপত্তা শুধু একটি পেশাগত ইস্যু নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম সূচক। অনুসন্ধানীমূলক গবেষণায় দেখা গেছে গত অন্তবর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরে সবচেয়ে বেশী নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে মফস্বল পর্যায়ের কর্মরত সাংবাদিকরা। শুধু নির্যাতনই নয়, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষন কর্মশালা, নির্বাচনকালীন সাংবাদিক প্রশিক্ষনে চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন মফস্বলের গণমাধ্যমকর্মীরা। উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা গত দেড় বছরে কোনো ধরনের সরকারী সুযোগ-সুবিধা পায়নি বলে শত শত অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে সাংবাদিক কল্যান ট্রাস্টের দান-অনুদান থেকেও বঞ্চিত প্রান্তিক পর্যায়ের কর্মরত সাংবাদিকরা। শুধু জেলা পর্যায়ের বিশেষ শ্রেনীর কিছু সাংবাদিক সকল সুযোগ সুবিধা কৌশলে আদায় করে থাকে বলে বিভিন্ন কর্মকান্ডে প্রতিয়মান হয়। এ বিষয়ে সরকারকে জরুরীভাবে নজর দেয়া প্রয়োজন বলে মফস্বল সাংবাদিকরা মনে করেন। তারা নতুন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আশু হস্তক্ষেপ কামনা কারেছেন।
লেখক:এস এম. জহিরুল ইসলাম,চেয়ারম্যান, রুর্যাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন (আরজেএফ)